Pages

Sunday, August 5, 2012

মাছ-পাখির অভয়াশ্রমে

pakhi
কালিম পাখি ‘ঠক-ঠক-ঠক, ঠকাঠক…’ সাতসকালে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। চোখ কচলে ঘড়ি দেখি, এত সকালে কড়া নাড়ে কে? দরজা খুলে দেখি ষাটোর্ধ্ব এক লোক দাঁড়িয়ে। নাম গফুর মিয়া। তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। তাঁর বাহন আমাদের পৌঁছে দেবে হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে। এই বিল দেখতেই রাতে পৌঁছেছি শ্রীমঙ্গল শহরে।
অনেক দিন থেকেই ভাবছিলাম বাইক্কা বিলে যাব। পাখি দেখব, ছবি তুলব। শেষে ইচ্ছে ও সময়ের সম্মিলন ঘটে এবারের ফেব্রুয়ারির শুরুতে।
আমরা তিন বন্ধু ঢাকা থেকে রওনা হই। রাত চারটায় শ্রীমঙ্গলের চৌমাথায় নামি। শীত প্রায় শেষ, তবু এখানে ঠান্ডা ভাব টের পেলাম। ঘুম ঘুম চোখে পথে নামলাম। হেঁটে হেঁটে হোটেল প্লাজায় উঠি। আমাদের বাহন পিচঢালা পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। ঘুমে ঢুলুঢুলু দুই চোখ। একসময় অটোরিকশার ঝাঁকুনিতে সজাগ হলাম। একসময় পিচের পথ ছেড়ে মেঠো পথ ধরে চলা শুরু করলাম। বাইরে তাকাতেই চোখ থেকে ঘুম পালাল। রাস্তার দুপাশেই অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ! কৃষক ক্ষেতে বীজ রোপণে ব্যস্ত। রাখাল ছেলে গরুর পাল নিয়ে মাঠে চলেছে। গরুর পাল একটু পরপরই আমাদের পথ আগলে দাঁড়াচ্ছিল। ক্যামেরা হাতে নেমে পড়ছিলাম বারবার। জেলেদের ছোট ছোট দল কাঁধে মাছ ধরার জাল, পিঠ কিংবা মাথায় মাছের ঝুড়ি, আবার কেউ কেউ বইঠা হাতে চলেছে। একদল কিশোর-কিশোরী সেই সক্কালে গোল্লাছুট খেলায় মত্ত। এসব দেখতে দেখতে একসময় থেমে যায় আমাদের বাহন। হিজল ও করচ বনের ভেতর দিয়ে আমরা হাঁটতে থাকি। পুরো এলাকায় ঢোলকলমির সমারোহ। বছরের এই সময়ে কেমন যেন রুক্ষ চারপাশ। ঘাসগুলো মরে লালচে হয়ে আছে। প্রকৃতি যেন বৃষ্টির অপেক্ষায়।
এবার বাইক্কা বিলে পৌঁছে গেছি। শত-সহস্র পাখির সমাহার। বিলের মাঠ একদিকে সাদা, আরেক দিকে নীল। সাদায় ভরিয়ে দিয়েছে বক, আর নীল করেছে কালিম পাখি। পাখিগুলোর উড়াল দেখতে দেখতে চলে যাই পর্যবেক্ষণ (ওয়াচ) টাওয়ারের কাছে। টাওয়ারের সিঁড়িতে পা রাখতেই আমাদের স্বাগত জানান আদর মিয়া। তিনি টাওয়ারের প্রধান। বাইক্কা বিল মাছের অভয়াশ্রম। সঙ্গে সঙ্গে পাখির চারণক্ষেত্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।
দুই চোখ ভাসিয়ে দিলাম বাইক্কা বিলের বিশাল জলাশয়ে। বহু দূর বিস্তৃত বিলে কেবল পাখি আর পাখি। পদ্মপাতায় ঢাকা বিল। বাইক্কা বিলকে এ জন্য স্থানীয় মানুষ পদ্ম বিলও বলে থাকে। বর্ষায় লাল পদ্মশোভিত বাইক্কা আরও সুন্দর। আদর মিয়া বললেন, ‘শীতে বাইক্কা বিলে মানুষ খুব বেশি আসে। কিন্তু ভাইজান, বর্ষাকালে বাইক্কা বিলে বেড়ানোর মজাই আলাদা।’ আমরা তখন পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের সর্বোচ্চ উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। হাতের ক্যামেরায় দ্রুত ক্লিক করছি। একসময় নৌকা চলে এল। তাতে চড়ে বসতেই পদ্মপাতায় মোড়া জলাশয় ভেদ করে এগিয়ে চলল তরতর করে। আমাদের ডানে-বাঁয়ে, সামনে-পেছনে, ওপরে-নিচে পাখি আর পাখি। মাঝি মতিন মিয়া বলে চলেছেন, ‘ওই যে নিউ পিপি, দল পিপি, ধুপনি বক, ভূতিহাঁস, ইগল, ঠেঙ্গি, আর রাজ সরালি।’
আমাদের উচ্ছ্বাস দেখে নৌকার মাঝি মতিন মিয়ার আক্ষেপ, ‘খুব ভোরের দিকে আর সূর্যাস্তের সময় পাখি দেখার সেরা সময়।’ মতিন মিয়া আমাদের পানির দিকে তাকাতে বললেন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ডুবসাঁতারে মাছ ছুটে চলেছে। মাছেদের ধাক্কায় আমাদের নৌকা দুলে উঠছে।
যাতায়াত, থাকা-খাওয়া
ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে যেতে হয় শ্রীমঙ্গল। সেখানে আবাসিক হোটেলে ওঠা যায়। আবার শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে কমলগঞ্জ সড়কে লাউয়াছড়া বনের কাছে রয়েছে চা বাগানের টি-রিসোর্ট। তবে এখানে থাকলে আগে থেকে অনুমতি নিতে হবে।
ফারুখ আহমেদ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মার্চ ০২, ২০১০

ঢাকার পাশে গাজীপুর

gazipur
ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা গাজীপুর। এ জেলার উত্তরে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা, দক্ষিণে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে ঢাকা ও টাঙ্গাইল জেলা অবস্থিত। এ জেলার বিভিন্ন স্থানে আছে বেশ কিছু বেড়ানোর জায়গা। ঢাকার পাশ্ববর্তী এসব জায়গায় ভ্রমণ নিয়ে কড়চার এবারের বেড়ানো।
জাগ্রত চৌরঙ্গী
গাজীপুর শহরের বেশ কিছুটা আগে জয়দেবপুর চৌরাস্তায় রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম স্মারক ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরে সংঘটিত প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামে শহীদ হুরমত আলীসহ অন্যান্য শহীদদের স্মরণে ১৯৭১ সালেই নির্মিত হয় হয় এ ভাস্কর্যটি। এর স্থপতি আব্দুর রাজ্জাক। ভাস্কর্যটির উচ্চতা প্রায় একশো ফুট। আর এর দু’পাশে ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১১ নং সেক্টরের ১০৭ জন এবং ৩নং সেক্টরের ১০০ জন শহীদ সৈনিকের নাম খোদাই করা আছে।
ভাওয়াল রাজবাড়ি
গাজীপুর সদরে অবস্থিত প্রাচীন এ রাজবাড়িটি। জমিদার লোক নারায়ণ রায় বাড়িটির নির্মাণ শুরশু করলেও শেষ করেন রাজা কালী নারায়ণ রায়। প্রায় পনের একর জায়গা জুড়ে মূল ভবনটি বিস্তৃত। ভবনটির দক্ষিণ পাশে মূল প্রবেশপথ। মূল প্রবেশপথের পরেই রয়েছে প্রশ্বস্ত একটি বারান্দা এবং এর পরে একটি হল ঘর। ভবনের ওপরের তলায় ওঠার জন্য ছিল শাল কাঠের তৈরি প্রশ্বস্ত সিঁড়ি। ভবনের উত্তর প্রান্তে খোলা জাগায় রয়েছে ‘নাটমণ্ডপ’। রাজবাড়ির সব অনুষ্ঠান হতো এ মঞ্চে। রাজবাড়ির মধ্যে পশ্চিমাংশের দ্বি-তল ভবনের নাম ‘রাজবিলাস’। এ ভবনের নিচে রাজার বিশ্রামাগারের নাম ছিল ‘হাওয়ামহল’। দক্ষিণ দিকে খোলা খিলান যুক্ত উম্মুক্ত কক্ষের নাম ‘পদ্মনাভি’। ভবনের দোতলার মধ্যবর্তী একটি কক্ষ ছিল রাণীমহল নামে পরিচিতি। সুরম্য এ ভবনটিতে ছোট বড় মিলে প্রায় ৩৬০টি কক্ষ আছে। বর্তমানে এটি জেলাপরিষদ কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরী
ভাওয়াল রাজবাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে মৃতপ্রায় চিলাই নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ভাওয়াল রাজ শ্মশানেশ্বরী। এটি ছিল ভাওয়াল রাজ পরিবার সদস্যদের সবদাহের স্থান। প্রাচীন একটি মন্দির ছাড়াও এখানে একটি সমাধিসৌধ আছে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান
গাজীপুর সদর ও শ্রীপুর থানা জুড়ে অবস্থিত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। পৃথিবীর অন্যান্য জাতীয় উদ্যানের আদলে ৬৪৭৭ হেক্টর জমিতে ১৯৭৩ সালে এ উদ্যান সরকারি ভাবে গড়ে তোলা হয়। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের মূল উদ্ভিদ হলো শাল। এছাড়াও নানা রকম গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ এ উদ্যান। জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বেশ কয়েকটি বনভোজন কেন্দ্র, ১৩টি কটেজ ও ৬টি রেস্ট হাউস আছে। উদ্যানে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৬ টাকা। এ ছাড়া পিকনিক স্পট ব্যবহার করতে হলে বন বিভাগের মহাখালী কার্যালয় থেকে আগাম বুকিং দিয়ে আসতে হবে।
সফিপুর আনসার একাডেমি
জেলার কালিয়াকৈর উপজেলায় অবস্থিত আনসার-ভিডিপি একাডেমির বিশাল চত্ত্বর বেড়ানোর জন্য একটি উপযুক্ত যায়গা। অনুমতি সাপেক্ষে বনভোজন করারও ব্যবস্থা আছে এখানে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে গাজীপুর যেতে পারেন রেল ও সড়ক পথে। ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী প্রায় সব আন্তঃনগর, কমিউটার, মেইল ট্রেনে চড়ে আসতে পারেন গাজীপুর। এছাড়া ঢাকার কাঁচপুর ও যাত্রাবাড়ী থেকে ট্রান্স সিলভা, অনাবিল, ছালছাবিল পরিবহন, লোহারপুল থেকে রাহবার পরিবহন, মতিঝিল থেকে গাজীপুর পরিবহন, ভাওয়াল পরিবহন, অনিক পরিবহন, সদরঘাট থেকে আজমিরি, স্কাইলাইন পরিবহন, গুলিস্তান থেকে প্রভাতী বনশ্রী পরিবহন ছাড়াও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাস সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলাচল করে গাজীপুরে বিভিন রুটে। ভাড়া ৪০-৬০ টাকা।
কোথায় থাকবেন
ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনেই শেষ করা সম্ভব গাজীপুর ভ্রমণ। তাই এখানে অবস্থান না করলেও চলে। তারপরেও শহরের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। এরকম হয়েকটি হোটেল হলো হোটেল আল মদিনা, থানা রোডে হোটেল মডার্ণ, কোনাবাড়িতে হোটেল ড্রীমল্যান্ড ইত্যাদি। এসব হোটেলে দৈনিক ১০০-২৫০ টাকায় থাকার ব্যস্থা আছে।
কিছু তথ্য
গাজীপুর থেকে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে যেতে হলে নিজস্ব পরিবহন না থাকলে জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে লোকাল বাস কিংবা টেম্পু যোগে যাওয়া ভালো। জাতীয় উদ্যানের বনভোজন কেন্দ্র ব্যবহার করতে হলে মহাখালী বন বিভাগের কার্যালয়ে এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন- ৮৮১৪৭০০। সফিপুর আনসার একাডেমিতে যেতে হলে ৭২১৪৯৫১-৯ এই নম্বরে যোগাযোগ করুন। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের বেশি ভেতরে গেলে সাবধানতা অবলম্বন করুন। একা একা কিংবা দু-তিনজন হলে বেশি ভেতরে না যাওয়াই ভালো।
আলোকচিত্র ও লেখা: মুস্তাফিজ মামুন
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, এপ্রিল ২০, ২০১০

চা বাগানে নতুন বছর

cha-bagan
চা বাগানে নতুন বছর বৃষ্টিস্নাত হয়ে এখন নতুন রূপে সেজেছে শ্রীমঙ্গল। অনেক দিনের খরা শেষে বৈশাখের শুরুতেই বৃষ্টির দেখা পাওয়া গেল। চায়ের বাগানগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পাহাড়-টিলায় নাম জানা না-জানা গাছগুলোর ডালপালা চুইয়ে পড়ছে বৃষ্টির বিন্দু। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বের হওয়া ঝরনাগুলোর পানি দেখেমনে হয় যেন ঢল নেমেছে। চারদিক থেকে সবুজ-সতেজ জীবনের হাতছানি। সজীবতার এ ডাক ফিরিয়ে দেয় কার সাধ্য? বছরের প্রথম দিনটিতে তো তা উপেক্ষা করতে পারলামই না।
১ বৈশাখ ১৪১৭ বঙ্গাব্দ। একদম ভোরে শ্রীমঙ্গল-শমসেরনগর সড়ক ধরে বেরিয়ে পড়লাম। শ্রীমঙ্গল শহর ছাড়িয়ে কিছু দূর এগোলেই চেখে পড়ে ঠেলাগাড়ির দীর্ঘ লাইন। একদল শ্রমজীবী মানুষ পাহাড়ি রাস্তায় দৌড়াচ্ছে আর ঠেলা ঠেলছে। কারও ঠেলায় আনারস, কারও ঠেলায় লেবু, কাঁঠাল, কলা। তাদের গন্তব্য শ্রীমঙ্গলের নতুন বাজার। ফলের পাইকারি এ বাজারটি সূর্যোদয়ের আগেই শেষ হয়ে যায়।
ডানে-বাঁয়ে চোখ ফিরিয়ে দেখলাম বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে চা গাছে নতুন কুঁড়ি গজিয়েছে। বাতাসে কাঁচা চায়ের মিষ্টি একটা গন্ধ অনুভব করলাম। চা গাছের কচি গাঢ় সবুজ পাতায় বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ফোঁটা জমে আছে। একটু পরেই চা বাগানের ছায়াবৃক্ষের ফাঁকে উঁকি দেবে সূর্য।
দেখতে দেখতে পুবের আকাশ অনেকটাই রাঙা হয়ে এসেছে। তারই খানিকটা আভা এসে পড়েছে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র ওপর, যেখানে ফোঁটায় ফোঁটায় জমে আছে বৃষ্টির বিন্দু। তার ওপর র্সূযের আলো পড়ে জ্বল জল করছে।
প্রকৃতি আর মানুষের সৃজিত চা বাগানের রূপলাবণ্য দেখতে দেখতে চা গবেষণাকেন্দ্রের (বিটিআরআই) রাস্তায় এসে পৌঁছালাম। চৌরাস্তার পাশেই বিশাল তিন-চারটি গাছের মগডালে পাখিদের কিচির-মিচির। দেখলাম সবুজ ঘুঘুর দল একে অপরের সঙ্গে মিতালি করছে।
ভোরের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম জেমস ফিনলে টি কোম্পানির কাকিয়াছড়া চা বাগানে। বাগানের লাইন (সারিবদ্ধ শ্রমিক বসতি) থেকে ভেসে আসছে শ্রমিক সরদারের হাঁক—‘রেন্ডি দফা দুইয়ে, দোছরা দফা সাতে…’।
হাঁক অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম। তিন-চার দিক থেকে এমন হাঁক বাতাসে ভেসে আসছে। লম্বা লাঠি হাতে প্রতিটি শ্রমিক লাইনে সরদাররা ঘুরে ঘুরে সুর করে হাঁকছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল সারিবদ্ধভাবে চা বাগানের নারী-শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেওয়ার জন্য লাইন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। শত শত নারী-শ্রমিক ছড়িয়ে পড়লেন চা বাগানের চারদিকে—মাঠে মাঠে।
রাস্তার দুই পাশে নারী-শ্রমিকের পাতা তোলার ছন্দময় দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম কাকিয়াছড়া পেরিয়ে ফুলছড়া চা বাগানে। সবখানেই একই দৃশ্য। চিরায়ত প্রাণের স্পন্দন।
রিকশা নিয়ে চা বাগানে বেড়ানোর মজাই আলাদা। ফুলছড়া চা বাগানের বাজার থেকে রিকশা নিলাম। ভাড়া প্রতি ঘণ্টায় ৬০ টাকা।
দুপুরে সূর্য যখন মাথার ওপরে। কালীঘাট চা বাগানের বিশাল বটগাছের কাছে বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে খানিকটা বিশ্রাম নিলাম। মুড়ি, পেঁয়াজ আর কাঁচা পাতার এক কাপ চা দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে অবসন্ন শরীরটাকে চাঙা করে আবারও পথ ধরলাম।
কালীঘাট পেরিয়ে ডিনস্টন চা বাগান। এ বাগানের বহুল পরিচিত নাম কেজুরিছড়া। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। কেজুরিছড়া চা বাগানে রয়েছে ‘ডিনস্টন সিমেট্রি’। খ্রিষ্টানদের এই কবরস্থানের সঙ্গে এ অঞ্চলে চা বাগানের গোড়াপত্তনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তাই চা বাগান কর্তৃপক্ষ এ কবরস্থানটিকে খুবই যত্ন করে রেখেছে।
১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীমঙ্গলে চায়ের আবাদ শুরু হয়। সে সময় থেকে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যেসব ব্রিটিশ সাহেব-মেম এবং তাঁদের শিশুরা মারা গেছেন, তাঁদের এখানে সমাহিত করা হয়েছে।
সিমেট্রি থেকে যখন ফিরছিলাম তখন পড়ন্ত বিকেল। শ্রমিকেরা মাঠ থেকে ফিরছেন। মাথায় তাঁদের কাঁচা পাতার বোঝা। সারিবদ্ধ এই ফেরা আরও একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে, যেখানে একজন বাবু (করণিক) পাতার ওজন মেপে নামের পাশে লিখে রাখবেন। ওখানে পাতা বুঝিয়ে দিয়ে তবে নারী-শ্রমিকেরা বাড়ি ফিরবেন।
ফিরতি পথে চা বাগানে সূর্যাস্ত উপভোগ করলাম। আস্তে আস্তে চা বাগানের ছায়াবৃক্ষের ফাঁক দিয়ে সূর্য ডুবছে। একসময় টকটকে লাল সূর্যপিণ্ড দিগন্ত বিস্তৃত সমান্তরাল চা গাছের আড়ালেই যেন হারিয়ে গেল। গাঢ় সবুজের মধ্যে লাল বৃত্ত। আমাদের পতাকাকেই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়।
চা বাগানে সবুজের মধ্যে শেষ হলো বাংলা বছরের প্রথম দিনটি। সারা বছর যদি এভাবেই কাটত!
কোথায় থাকবেন কীভাবে থাকবেন
শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে বেড়াতে হলে সবচেয়ে ভালো থাকার ব্যবস্থা রয়েছে চা গবেষণা কেন্দ্র ও প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের দুটি রেস্ট হাউস। আর আছে চা বোর্ডের টি রিসোর্ট। এ তিনটিই চা বাগানের মধ্যে। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল শহরে থাকার ভালো আবাসিক হোটেল রয়েছে। আছে গেস্ট হাউস। ৫০০-৬৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়ায় এসব আবাসিক হোটেল, রেস্ট হাউস, গেস্ট হাউস পাওয়া যাবে। তবে মনে রাখবেন, ভ্রমণের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। আর আগেই বলেছি, রিকশা নিয়ে চা বাগানে ঘোরার মজাই আলাদা। ৬০ টাকা ঘণ্টা হিসেবে রিকশা ভাড়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া শহরের পেট্রলপাম্প মোড়ে কার-মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায়। সারা দিনের জন্য দূরত্ব বিশেষে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে হবে।

সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে

kapotakh-nod
কার কাছে যেন শুনেছিলাম গল্পটা। এক আগন্তুক বাংলার কোনো এক গাঁয়ে গিয়ে এক লোকের কাছে জানতে চাইলেন, এখানে কপোতাক্ষ নদ কোথায়। লোকটি আগন্তুককে বললেন, যে নদীতে দেখবেন কোনো পালতোলা নৌকা চলে না, ধরে নেবেন সেটাই কপোতাক্ষ নদ।’
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত সেই নদ দেখব, এমন আশা অনেক দিনের।
‘সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে।
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।’
কবির লেখা এ লাইন দুটো যেন মনে গেঁথে ছিল। হঠাৎ করেই সুযোগ জুটে গেল। সিইজিআইএস থেকে পরিবেশ গবেষণার কাজে যেতে হয়েছিল যশোর। আর বেশ কটা দিন পথ চলতে হয়েছিল সেই কপোতাক্ষের বাঁকে বাঁকে। সে কথাই লিখছি।
যশোর নেমে যাত্রা করলাম গঙ্গানন্দপুর গ্রামের উদ্দেশে। গ্রামের ভেতর পায়ে হেঁটে ২০ গজ এ গানোর পরই প্রথমে কপোতাক্ষ নদের সঙ্গে দেখা। নদীতে কচুরিপানা থাকে জানি, কিন্তু কপোতাক্ষ নদে কচুরিপানা দেখে মনে হলো এত কচুরিপানা দেশের অন্য কোনো নদীতে নেই। পালতোলা নৌকা চলবে কী করে? নদের পানি শান্ত ও স্থির। এক বৃদ্ধ তালের ডোঙায় বসে আছেন মাছ ধরার জন্য। নদের দুই পাড়েই সবুজের সমারোহ। কয়েকটা জলমোরগ ঘোরাফেরা করছে। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে কচুরির বনে। পাখির ছবি তুলতে দেখে গাঁয়ের এক ছেলে আমাকে দুর্গাটুনটুনির বাসা দেখাতে নিয়ে গেল।
এবার পৌঁছলাম ঝিকরগাছা। যশোর রোড়ের বিখ্যাত সেই সব রেইনট্রির সারি প্রথমে চোখে পড়বে এখানে। ঝিকরগাছা গিয়েও নদের সেই একই রূপ। তবে এখানে কচুরিপানা আরও বেশি।
এরপর পানিসারা হয়ে হরিহরনগর যাওয়ার পথে খেজুরগাছের সারি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। বাংলাদেশের সব খেজুরগাছ যেন নিয়ে আসা হয়েছে যশোরের মাঠেঘাটে। গোপালগঞ্জ যেমন তালগাছের জন্য বিখ্যাত, যশোর তেমনি খেজুরগাছের জন্য। এরপর জগিখালী, ত্রিমোহনীর পথ ধরলাম। ত্রিমোহনী এসে আরেকটি নদীর সঙ্গে দেখা হলো, নাম তার বুড়িভদ্রা। বিকেল গড়িয়ে এল। পথে নীলগলা বসন্তবৌরির ডাকে মনটা আনচান করতে থাকে। বাংলাদেশের আর কোনো জেলায় এত নীলগলা বসন্তবৌরি দেখিনি। চাকলা নামের এক গ্রামে এসে দেখি রশি টানা খেয়া। নদের দুই পাড়ে খুঁটি গেড়ে এপার-ওপার রশি বেঁধে দেওয়া। নদীতে আছে নৌকা। নৌকায় দাঁড়িয়ে যদি কেউ রশি টান দেয়, তাহলে নৌকা সামনের দিকে চলে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ফেরার পথে প্রায় ৩০টি গরুর গাড়ির দেখা মিলল। ছেলেমেয়ে, যুবক, বুড়ো সবাই মিলে বেড়াতে বের হয়েছেন। নানা রকম সাজসজ্জা, গান ও বাদ্যযন্ত্রের পসরা সাজিয়ে তাঁরা চলছেন।
পরের দিন সকালে সাগরদাঁড়ির পথ ধরি। কেশবপুর উপজেলায় এসে কিছুক্ষণ যশোরের হনুমানদের খোঁজ করি। কিন্তু এ যাত্রা তাদের দেখা মিলল না। ওরা দলবেঁধে অন্যদিকে চলে গেছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই চলে আসি সাগরদাঁড়ি। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটায়। নদের ঘাটেই প্রথম যাই। ঘাটে নাও ভেড়ানো আছে। কয়েক ঝাঁক মাঝলা ও গো-বগ খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। দত্তবাড়ির ঘাট থেকে একটু দূরেই কবির বাড়ি। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাড়ি ও অন্য সবকিছু সংরক্ষণ করা হয়েছে। টিকিট কেটে কবির বাড়ি ঢুকতে হবে। বেশ কিছু বড় আমগাছ আছে বাড়িটিতে। আরও আছে ঘাট বাঁধানো পুকুর। পাতিমাছরাঙা সব সময় আনাগোনা করে এ পুকুরে। বাড়ির ভেতরে আছে কবিপরিবারের ব্যবহূতসামগ্রী। যেমন—দা, আলনা, খাট, থালা, কাঠের সিন্দুক, কবির লিখিত পাণ্ডুলিপি, পারিবারিক ছবিসহ নানা কিছু।
সাগরদাঁড়ি দেখে কুমিরা, ইসলামকাঠি হয়ে আমরা তালা উপজেলায় পৌঁছালাম। পথে বেশ কিছু বিল পড়ে। শালিখা ও জালালপুর বিল এর মধ্যে অন্যতম। তালা গিয়ে কপোতাক্ষ নদে জোয়ার দেখা গেল। কিছু বড় নৌকা ছিল নদে। জোয়ারের পানিতে বেশ পলি। পলি জমে ওখানে নদ ভরাট হয়েযাচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির প্রবাহ। সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা গিয়ে দেখা গেল নদের পাশের কেওড়াগাছ মরে গেছে। নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হলে এ গাছগুলো মারা যেত না।
কপোতাক্ষ নদের উৎপত্তি দর্শনার কাছে মাথাভাঙা নদী থেকে। এরপর চৌগাছা, ঝিকরগাছা, চাকলা, ত্রিমোহনী, জীবনগর, কোটচাঁদপুর, সাগরদাঁড়ি, তালা, কপিলমনি, বারুলী, চাঁদখালী, বড়দল, আমাদী, বেদকাশী প্রভৃতি স্থানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুন্দরবনের মধ্যে খোলপেটুয়া নদীর সঙ্গে মিশেছে। এখন সাগরদাঁড়ি থেকে কপিলমনিয়া পর্যন্ত হাঁটু কিংবা কোমর অবধি পানি। নিয়মিত জোয়ার-ভাটা নেই বলে স্রোতও নেই। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে কপোতাক্ষের সঙ্গে গঙ্গা নদীর মূল স্রোতধারা বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল বর্ষার সময় নদীতে অল্প পরিমাণ পানি আসে। এখন একমাত্র বর্ষার পানিই কপোতাক্ষের পানির প্রধান উৎস। কথিত আছে, কপোতের অক্ষের (কবুতরের চোখ) মতো স্বচ্ছ পানি বলে এ নদের নাম হয়েছিল কপোতাক্ষ। কিন্তু কপোতাক্ষের পানি আজ ঘোলা। এলাকাবাসীর অভিমত, ঠিকভাবে খনন করা হলে আবার কিছুটা হলেও সজিব হয়ে উঠবে কপোতাক্ষ। সেদিন হয়তো একটি পালতোলা নৌকার দেখা পাবেন সেই আগন্তুক।
কীভাবে যাবেন ও কোথায় থাকবেন
সাগরদাঁড়িতে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি যেতে চাইলে প্রথমে যেতে হবে যশোর। এরপর যশোর শহর থেকে বাসে করে কেশবপুর। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশা বা মাইক্রোবাসে করে সাগরদাঁড়ি যেতে হবে।
যশোর শহর থেকে সাগরদাঁড়ি পর্যন্ত প্রায় দু্ই-আড়াই ঘণ্টা পথ। দত্তবাড়ির কাছেই আছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের রেস্টহাউস। সেখানে থাকতে পারেন অথবা থাকতে পারেন কেশবপুর উপজেলা ডাকবাংলোতে। তবে আগে থেকেই কথা বলে রাখতে হবে।
সৌরভ মাহমুদ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ০৪, ২০১০

ঘুরে দেখি নারায়ণগঞ্জ

narayanganj
ঢাকার পার্শ্ববর্তী অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র এবং নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জ। জেলার উত্তরে নরসিংদী ও গাজীপুর জেলা, দক্ষিণে মুন্সীগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে ঢাকা জেলা এবং পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা জেলা। এ জেলায় বেড়ানোর জায়গাগুলো নিয়ে কড়চার এবারের বেড়ানো। ছবি তুলেছেন ও লিখেছেন মুস্তাফিজ মামুন
হাজীগঞ্জ দূর্গ : নারায়ণগঞ্জ জেলাশহরের কিল্লারপুলে অবস্থিত ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ দুর্গ। বাংলার বারভূঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁর কেল্লা হিসেবেও অনেকের কাছে এটি পরিচিত। নদীপথে মগ ও পর্তুগিজদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য মীরজুমলার শাসনামলে এ দুর্গ নির্মিত বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। চতুর্ভুজাকৃতি এই দুর্গের প্রাচীরে রয়েছে বন্দুক বসিয়ে গুলি চালাবার ফোকর।
সোনাকান্দা দুর্গ : শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরে অবস্থিত এ জলদুর্গটি। হাজীগঞ্জ দুর্গের প্রায় বিপরীত দিকেই এর অবস্থান। নদীপথে ঢাকার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নদীপথগুলোর নিরাপত্তার জন্য মুঘল শাসকগণ কতগুলো জলদুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সোনাকান্দা দুর্গ।
বিবি মরিয়ম মসজিদ ও সমাধি : নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত এ মসজিদটি হাজীগঞ্জ মসজিদ নামেও পরিচিতি। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি শায়েস্তা খাঁ কর্তৃক ১৬৬৪-১৬৮৮ সালে নির্মিত বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। মসজিদের কাছে তাঁর কন্যা বিবি মরিয়মের সমাধি রয়েছে বলেই মসজিদটির নাম বিবি মরিয়ম মসজিদ বলে অনেকে মনে করেন।
কদমরসুল দরগা : নারায়ণগঞ্জ শহরের বিপরীত দিকে শীতলক্ষা নদীর পূর্ব পাড়ে নবীগঞ্জে অবস্থিত কদমরসুল দরগা। এখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কদম মোবারকের ছাপ সংবলিত একটি পাথর রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট অকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান নেতা মাসুম খান কাবুলি পদচিহ্ন সংবলিত এ পাথরটি একজন আরব বণিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। ঢাকার জমিদার গোলাম নবী ১৭৭৭-১৭৭৮ সালে এ সৌধটি নির্মাণ করেন। আর কদম রসুল দরগার প্রধান ফটকটি গোলাম নবীর ছেলে গোলাম মুহাম্মদ ১৮০৫-১৮০৬ সালে নির্মাণ করেন।
শীতলক্ষা নদী : নারায়ণগঞ্জের প্রধান নদী। এক সময় বিশ্বসমাদৃত বাংলাদেশের মসলিন শিল্প গড়ে উঠেছিল শীতলক্ষার দুই তীরে। এখন বিভিন্ন কলকারখানায় পরিপূর্ণ নদীর দুই পাশ। নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ নৌ ভ্রমণে ভালো লাগবে সবার।
রূপগঞ্জ জামদানি পল্লি : শীতলক্ষার তীরে রূপগঞ্জ থানার রূপসীতে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় জামদানী পল্লি। রূপসী বাজার ও এর আশপাশে শতশত জামদানি শিল্পী দিন-রাত তাঁতে বুনেন নানা রকম শৈল্পিক জামদানি। তুলনামূলক কম দামে এখান থেকে ভালো মানের জামদনি শাড়ি কেনা যায়।
মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি : নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ায় রয়েছে প্রাচীন একটি জমিদার বাড়ি। বর্তমানে এ বাড়িতে চলছে মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজের কার্যক্রম। জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে বিশাল আকৃতির পুকুর। প্রাচীন এ প্রাসাদটি বেশ আকর্ষণীয়। প্রায় ৯৫টি কক্ষ সংবলিত এ প্রাসাদে অতিথিশালা, নাচঘর, পূজামণ্ডপ, কাছারিঘর, আস্তাবলসহ আরো বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত।
রাসেল পার্ক : মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির পাশেই বেসরকারি একটি বনভোজন কেন্দ্র রাসেল পার্ক। নানারকম গাছ-গাছালি ছাড়াও এখানে আছে ছোট একটি চিড়িয়াখানা। সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এটি।
সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের সমাধি : নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার মোগড়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের সমাধি। পাথরে তৈরি এ সমাধিসৌধটি ১৪১০ সালে নির্মিত হয়। সুলতান মারা যান ১৪০২ সালে। এ সমাধিসৌধের পূর্ব পাশের ইট-নির্মিত সমাধিটি সুলতানের প্রধান বিচারপতি কাজী সিরাজউদ্দিনের বলে অনুমান করা হয়।
লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন : জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় অবস্থিত লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগড়াপাড়া থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। বাংলার বারভূইঁয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁর শাসনামলে বর্তমান সোনারগাঁও বাংলার রাজধানী ছিল। বর্তমানে এখানে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের একটি জাদুঘর ছাড়াও প্রাচীন অনেক নিদর্শন বিদ্যমান। ১৯৭৫ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর। শনিবার থেকে বুধবার প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে লোকশিল্প জাদুঘর। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা, মাঝে ১২ টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মধ্যাহ্ন বিরতি। বৃহস্পতিবার লোকশিল্প জাদুঘর বন্ধ থাকে। কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে প্রবেশমূল্য দশ টাকা।
পানাম নগর : লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গোয়ালদী গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক পানামনগর। প্রাচীন এ নগরীর ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান এখানে। পানামনগরের পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক পনাম পুল।
গোয়ালদী শাহী মসজিদ : পানামনগর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ঐতিহাসিক গোয়ালদী শাহী মসজিদ। ঐতিহাসিকগণের মতে মসজিদটি ১৫১৯ সালে নির্মিত। একগম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি বাইরে পোড়ামাটির অলংকরণে সমৃদ্ধ।
কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের পথে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলাচল করে আসিয়ান, বন্ধন, উৎসব, সেতু, আনন্দ ইত্যাদি পরিবহনের বাস। ঢাকার বায়তুল মোকাররম ও গুলিস্তান থেকে এসব বাস পাঁচ মিনিট পর পর ছেড়ে যায় নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে। ঢাকা থেকে সোনারগাঁও যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো সার্ভিস বোরাক, সোনারগাঁও ইত্যাদি। এছাড়া ঢাকা থেকে কুমিল্লা, দাউদকান্দিগামী যে কোনো বাসে উঠে মোগড়াপাড়া নেমে সহজেই আসা যায় সোনারগাঁও।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, এপ্রিল ২৭, ২০১০